কালিহাতীতে কৃষি জমির মালিকানা, ডিজিটাল সেবা ও জলবায়ু সংকট: মাঠপর্যায়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
নিজস্ব প্রতিবেদক টাঙ্গাইল: মো: নিহাল খান
কৃষি জমির সঠিক মালিকানা, জমি হাতবদল ও রেকর্ড ডিজিটালাইজেশন, সীমানা সংক্রান্ত জটিলতা এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় কৃষক, ভূমিহীন শ্রমিক ও নারী কৃষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরতে একটি বিশেষ ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন (এফডিজি) বা মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার(২৬ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি অফিসে এলাকার বিভিন্ন পর্যায়ের শ্রমজীবীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও গোপনীয়তা বজায় রেখে অংশগ্রহণকারীদের মতামত সংগৃহীত হয়।
মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন,ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব তোফাজ্জল হোসেন।
আলোচনায় উঠে আসা প্রধান বিষয়সমূহ
১. কৃষি জমি ও শ্রমের বর্তমান চিত্র
অংশগ্রহণকারীরা বিগত ১০-১৫ বছরের কৃষি জমির রূপান্তর তুলে ধরেন। তারা জানান, নানা কারণে আগের তুলনায় ফসলি জমি সংকুচিত হচ্ছে। গৃহনির্মাণ, বাণিজ্যিক রূপান্তর এবং অন্যান্য অকৃষি খাতে জমির ব্যবহার বাড়ায় উর্বর কৃষি জমি কমছে। একই সাথে কৃষিকাজে শ্রমিকের সংকট এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া নিয়ে কৃষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। উর্বর জমি রক্ষায় সরকারি জোরালো নীতিমালা ও তার সঠিক প্রয়োগের তাগিদ দেন তারা।
২. ক্ষুদ্র ও খণ্ডবিখণ্ড জমির ভোগান্তি
উত্তরাধিকার সূত্রে জমি বণ্টনের ফলে এক একটি পরিবারের জমি ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ছে। ফলে সেচ ব্যবস্থা, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, যাতায়াত এবং অতিরিক্ত সময় ও খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব সমস্যার কারণে জমি একত্রীকরণ বা বিনিময়ের কার্যকর আইনি ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেন তারা।
৩. ই-মিউটেশন ও ডিজিটাল ভূমি সেবা
জমির রেকর্ড সংশোধন ও নামজারি (মিউটেশন) প্রক্রিয়ায় কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। অনলাইন বা ই-মিউটেশন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় সেবা প্রক্রিয়ায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসলেও, অনেক কৃষক সরাসরি ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে অভিজ্ঞ নন। ফলে তারা স্থানীয় কম্পিউটারের দোকান বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনার দাবি জানান অংশগ্রহণকারীরা।
৪. জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই কৃষি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খরা, অনাবৃষ্টি, অসময়ে বন্যা, নতুন নতুন কীটপতঙ্গ ও উদ্ভিদের রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ফসলের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কৃষকরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে নানা উপায়ে এসব সমস্যা মোকাবেলার চেষ্টা করলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে জানান। জলবায়ু সহনশীল জাতের বীজ, সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ ও সরকারি কারিগরি সহায়তার ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেন।
মুক্ত আলোচনা ও সুপারিশ
সমাপনী পর্বে অংশগ্রহণকারীরা কৃষি জমি রক্ষা, পারিবারিক জমি বণ্টন সহজীকরণ এবং অনলাইন ভূমি সেবা সম্পর্কিত বিভিন্ন বাস্তবসম্মত পরামর্শ প্রদান করেন। এলাকার কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক ও লাভজনক রাখতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারী সকল কৃষক-কিষাণীকে তাদের মূল্যবান সময় ও গুরুত্বপূর্ণ মতামত দেওয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো হয়। একই সঙ্গে সংগৃহীত তথ্যের পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষার আশ্বাস দিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।